গল্পঃ পরিবর্তন

  • Share this:

সিগারেট হাতে দেওয়ার পর পরই ছুড়ে ফেলে দিতেই রিফাত বিস্ময় নিয়ে তাকাল। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হতাশ গলায় বললো,

- কিরে তুই আগুন না ধরিয়ে ফেলে দিয়েছিস কেন ?

আমি গলার স্বর নিচু করে বললাম,

- দেখ রিফাত, এখন রমজান মাস। এই রমজানে রোজা রেখে নিজেকে একটু হলেও পাল্টানো উচিত।

আমার কথা শুনে ছোট একটি হাসি দিয়ে জোরালো গলায় বললো,

- সামান্য একটু পরিবর্তনে কোন লাভ নেই। এই সব ভংচং বাদ দিয়ে পকেট থেকে লাইটার বের কর। ফেলে দিয়েছিস সমস্যা নেই, আমি আরেকটা সিগারেট দিচ্ছি। এ'কথা বলেই রিফাত পকেট থেকে আরো একটা সিগারেট বের করলো।

আজকে সাথে করে লাইটার নিয়ে আসি নি। খুব ভালো করে আমার পকেট দুটি হাতিয়ে দেখল সাথে লাইটার নাই। না দেখে রিফাত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,

- আরে ব্যাটা, এই রমজান মাসের সামান্য পরিবর্তনে কিছুই আসে যায় না। এর চেয়ে ভালো দোকান থেকে একটা লাইটার কিনে নিয়ে আস, এমনিতেই হাতে টাকা নেই। রমজানে মাস বলে বাবা পকেট খরচের টাকা দিতে চায় না, বাবার সাথে এক প্রকার ঝগড়া করে কিছু টাকা এনেছি।

রিফাতের কথা শুনে জোরালো গলায় বললাম,

- পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। এই রকম সামান্য পরিবর্তন থেকেই মানুষ এক সময় পুরোপুরি ভাবে পাল্টানোর সাহস খুঁজে পায়। আমরা দু'জন কমপক্ষে এই রমজান মাসে সিগারেট খাওয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা তো করতে পারি।

- হইছে, এসব লেকচার মারা বন্ধ কর। তুই খাইলে খাবি, না খাইলে নাই। আর শোন, একটা কথা ভালো করে মনে রাখবি, এই রকম সামান্য পরিবর্তনে কোন লাভ নাই।

লাভ-লসের হিসেব রিফাতকে বোঝাতে পারবো না বুঝতে পেরে তারাতারি করে বাসায় ফিরলাম। আজকে অনেকদিন পর রোজা রেখেছি, ইফতারের মাত্র কিছুটা সময় বাকি।

বাসায় ঢুকতেই দেখি আজকে টেবিলের উপর ইফতারের ভিন্ন রকম আয়োজন। ঘরে বাবা-মা আর আমি, এই তিনজন মানুষের জন্য এতসব আয়োজন দেখে বাবাকে বললাম,

- অফিস থেকে আসার সময় এত খাবার নিয়ে আসার কি দরকার ছিল ?

আমার বাবা দেবিদ্বার উপজেলায় ভূমি অফিসে চাকুরি করে। কয়েক বছর পর পর পদোন্নতি পেয়ে এখন খুব ভালো পোস্টে আছেন। আমার কথা শুনে তিনি হাসিমুখে বললেন,

- রমজান মাসে ভালো ভালো খাবার খেতে হয়, এই মাসে খাবারের কোন হিসেব নেওয়া হয় না, যত ইচ্ছে খাওয়া যায়। যাকে বলে তৃপ্তি ভরে খাওয়া।

- তাই বলে ইফতারে এতকিছু ?

বাবা কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে বললেন,

- আজকে একটা পার্টি এসেছিল জমির ঝামেলা নিয়ে, তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের বকশিস পেয়েছি।

মা আমার পাশে দাঁড়িয়ে শরবত বানাচ্ছেন। আমি হতাশ গলায় বললাম,

- জমির ঝামেলার সমাধান করাই তো আপনার দায়িত্ব, এই দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার আপনাকে মাসে মাসে বেতন দেয়। তাহলে মানুষ আপনাকে এত টাকা বকশিস দিবে কেন ? এটা কি শুধুই বকশিস ছিল, নাকি অন্যকিছু ? যদি অন্যকিছু হয়ে থাকে তাহলে কমপক্ষে রোজার এই পবিত্র মাসে হলে ও এসব টাকা থেকে নিজেকে দূরে রাখার দরকার ছিল।

হঠাৎ করে বাবাকে এমন কথা বলায় মা চমকে উঠলেন। মা কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। মাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বাবা বললেন,

- রোজার মাস হয়েছে তো কি হয়েছে ? রোজার মাস বলে কি খরচ কমেছে, উল্টো খরচ বেড়েছে।

- বিলাসিতা দেখিয়ে এসব অপ্রয়োজনীয় খরচ করলে খরচ তো বাড়বেই। এই রোজার মাসের কয়েকটা দিনের জন্য হলে ও নিজেকে পাল্টিয়ে দেখেন। পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। কয়েকটা দিনের জন্য নিজেকে পাল্টালেই দেখবেন ভবিষ্যতে বড় ধরণের পরিবর্তনে ও মনের ভেতর সাহস তৈরি হবে।

কথা শুনে বাবা আমাকে বোঝাতে কানের কাছে এসে বললেন,

- তুই বয়সে এখনো অনেক ছোট, তাই টাকার মূল্য বুঝিস না। আরেকটু বড় হলেই দেখবি তোর চিন্তাধারা ঠিক হয়ে গেছে।

প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেছে রিফাতের সাথে দেখা হয় না। বিকেলে প্রায় সময় সে ঈদগাহ মাঠে আসতো। এই সপ্তাহে একদিন ও আসে নাই দেখে তার বাড়িতে গেলাম।

প্রথমে মনে হয়েছে পুরো বাড়িতে কেউ নেই, বাইরে থেকে রিফাতকে ডাকতেই তার মা বেরিয়ে আসলেন। যখনি এই বাড়িতে আসি রিফাতের মা আমাকে দেখলেই হাসিমুখে কথা বলেন। আজকে মন খারাপ দেখে নিচু গলায় রিফাতের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। প্রথমে কিছু বলতে না চাইলে ও কিছুক্ষণ পর বিষণ্ণ গলায় বললেন,

- ছেলেটা তার বাবার সাথে মারামারি করে মামার বাড়ি চলে গেছে।

কথা শুনে হতভম্ব হয়ে বললাম,

- বাবার সাথে মারামারি মানে ?

- রিফাত সিগারেট খাওয়ার টাকা চেয়েছিল। রোজা না রেখে সিগারেট খেতে চাওয়ায় টাকা দেয়নি। এই নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে করতে এক পর্যায়ে মারামারি।

রিফাতের মায়ের মুখে এমন কথা শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। রমজানের ঠিক এই সময়টাতে সামান্য পরিবর্তনটা কতোটা জরুরী ছিল তা ভাবতে ভাবতে বাড়ির কাছে আসলাম।

বাড়িতে গেইটের কাছে আসতেই হঠাৎ মায়ের চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম। চিৎকার শব্দ শুনে বুকটা কেঁপে উঠলো। আমি ঘরের ভেতর দৌড়ে ছুটে যেতেই দেখলাম মা বারান্দায় বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। আমি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে বললাম,

- কাঁদছো কেন ? এভাবে তো তোমাকে কখনো কাঁদতে দেখিনি।

মা শাড়ির আচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন,

- দেবিদ্বার থানা থেকে ফোন এসেছিল। তোর বাবার অফিসে পুলিশ এসেছিল, এসে তোর বাবাকে ধরে থানায় নিয়ে গেছে। কারণটা জানার জন্য অফিসের একজন কলিগকে ফোন দিয়েছিলাম।

অফিসের কলিগ মাকে ফোনে কি বলেছে এটা বুঝার বাকি রইলো না। বকশিসের টাকা মনে করে বাবা যে টাকা উপার্জন করতো সেই টাকা উপার্জনের অপরাধে বাবাকে এবার সত্যিই জেল খাটতে হবে।

টাকা দিয়ে বাবা হয়তো খুব তারাতারি জেল থেকে বের হয়ে আসবে। কিন্তু যে আত্মসম্মান বোধ হারাবে তা আর পুরো এক জীবনে ও ফিরে পাবে না।

মাকে সান্ত্বনা দিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছি। কান্না থামছে না, বাবার জন্য আমার নিজের ও খুব আফসোস হচ্ছে। আফসোস করতে করতে ভাবছি - খুব বড় ধরণের পরিবর্তন নয়, রমজানের এই সময়টাতে সামান্য সময়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি নিজেকে পাল্টানো শুরু করতো, তাহলে হয়তো আত্মসম্মান বোধ নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে যেতে পারতো।

 

লেখকঃ- #মতিউর_মিয়াজী

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।