অনুতাপ

সাজু স্যারকে আমার খুব বিরক্ত লাগে।মনে হয় মুখে একটা কালো কাপর বেঁধে রাতের অধারে গিয়ে মেরে মাথা ফেটে দিয়ে আসি।

একটা সময় বেশ পছন্দের ছিল।সহজ সরল গঠনের মানুষটাকে দেখলেই কেমন জানি একটা ভালো লাগা শুরু হতো।স্যার আঞ্চলিক ভাষা কথা বলতেন। স্যার প্রতিদিন সাইকেলে করে আসতেন।ক্লাসে ঢোকার আগে সাইকেলটা একবার পরিষ্কার করে ঢুকতেন আর বের হবার পর আবার পরিষ্কার করতেন।একদিন স্যার কে বললাম স্যার,আপনি সাইকেলটার এত যত্ন নেন কেন? কি আছে এই পুরানো সাইকেলে?, 
স্যার বলল, শিহাবরে এই সাইকেলে ডা আমার বাপের দেওয়া। বাপে দেওয়া জিনিস তো তাই বড় মায়া লাহে ।বাপে  সব জিনিস আমি যতনে রাখছি।বাপ কই ছিল" সাজুরে সাইকেল ডা যেন উঠাই রাহিস নে, সাইকেল ডা চালাস।"তাই চালাই।
একদিন ডাকাত পড়ছিল সাইকেল টা চায়।দেই না সেকি মার।মরতে মরতে বাইচা গেসি।এত পিডাইছে তাও সাইকেল ছাড়ি নাই।
 আর একবার তো তোর চাচির অসুখে যাই যাই অবস্হা,  ট্যাহা পয়সা না।মেয়ের বিয়ার জন্যি একখানা চেন বানাইছিলেম সেইডা বেচচি তাও এই সাইকেল ডা বেচি নাই।
এই কথা বলেই স্যার হো হো করে হাসতে লাগলেন।
স্যার হাসছিল ঠিকি কিন্তু তাতে কেমন যেন একটা অনুসুচনা ছিল। হয় চাচির জীবনের চেয়ে সাইকেলের বেশি  গুরুত্ব দেওয়া অনুতাপ নয় তো সাইকেলের মায়া ত্যাগ না করে মেয়ে চেন বেচার অনুতাপ।

সে কথা যাক।আমার স্যারকে আমার অপছন্দের কারন ইদানিং স্যার পড়া না খুব গালিগালাজ করে।সেদিনই পড়া না পাড়ায় বলতিছিল " তোর খুব অহংকার হইছে না।পড়া শুনা করস না।ভাব! খুব ভালো ছাত্র হইসস পড়া লেহা করতে হয় না। বাইর হ ক্লাস থাইহা হারামজাদা।
একটু আদর কর জন্যি মাথায় উঠছে।পড়া শুনা ছাড়ি দিসস!বাইর হ।

কি আর করার বাহির হলাম।এখন প্রতি দিন এমন হয়।আমি পড়া শুনা করি না।আগে করতাম।বেশির ভাগ সময় প্রথম হতাম।বাট ইদানিং পড়াশুনা করি না। 
পড়াশুনা না করার কারন আছে।বাবা মারা গেছেন।মধ্যবিত্তদের যা হয় আরকি।আয় করার মানুষটা আর না থাকলে পথে বসতে হয়। আমার তাই হলো।

শুরু করলাম অটো চালানো। কথায় আনলাম আঞ্চলিকতা।
৩ঃ৩০ এ ছুটি দিত কলেজ।বাড়ি এসে খাওয়া দাওয়া  করে যাই মহাজনের কাছে ওটো নিতে।মহাজন জন কে দিতে হয় ৩০০ টাকা আর সারা দিনের আয়ই ৪৫০ টাকা খুব জোড় ৫০০ টাকা।দিনের শেষে ১৫০ কিংবা ২০০ টাকা পকেটে থাকে মাত্র।ওটো চালাই ৪ টা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত। বাড়ি যাইয়া হাত মুখ ধুইয়া খাইতে খাইতেই ঘুম আসে। মনে হয় খাওনের প্লেটেই ঘুম দেই।বিছানা গা দিতেই রাজ্যের ঘুম।সকালে টের পাই ৮ টা তারপর ৯টা কলেজ যাই। পড়া লেখা হয় ক্যামনে।

যহন পড়া পারতাম স্যার বড় আদর করত।স্যারদের এই এক নীতি পড়া পারলে সে খুব ভালো আর না পারলেই অপমান।

এহন আর সহ্য হয় না।তাই আমিও ঘাড় ত্যাড়ামো করি।স্যাররে দেখলে সালাম না দিইয়াই যাই।ভাব খানা এমন, পারলে কিছু করেন,সালাম দিমু না।ক্লাসে গালি দিলে মুখখান আন্ধার করে রাখি বুঝাতে চাই আপনার কথা আমার ভালো লাগে না।যখন বলে মাথা উঠসো তখন মনে হয় বলি আপনার মাথায় ওঠার ইচ্ছা না আমার। জান গা।

পার হইল অনেক দিন।পরিক্ষার আগের তিনডা মাস ভালা করে পড়লাম।কিন্তু হটাৎ একটা নোটিশ আসল।সিদ্ধান্ত নিলাম পরিক্ষা দেবনা।তবে সেটা  সবাইরে বলব পরিক্ষার আগের দিন ।আমরা সব বন্ধুরা পাশ করনের লাইগা পড়তাছে।
আমিও পড়তেলাগলাম।পরিক্ষার আগের দিন ভাবতাছি কারো প্রথম কমু যে আমি আর পড়া লেহা করুম না পরিক্ষা দিমু না।হঠাৎ দেখি বন্ধু শামসুল।ও এদিকে আইসা কইল, "ওই শালা প্রবেশ পত্র কি তোর বাপ আনব।তোর কোন বাপ আছে প্রবেশ পত্রছাড়া ঢুকতে দিব তোরে।হালা তুমার জন্য আমারে আসা লাহে
"
প্রবেশ পত্র হাতে পাওয়ার পর কলিজা ডা কেমুন জানি ছ্যাত করে উঠল। পরিক্ষা দিমু না কেন!
 দিমু পাশ হোক, ফেল হোক দিমু।যাইয়া পড়ন শুরু করলাম পরিক্ষা দিলাম।

রেজাল্ট পাইলাম। ৫ঃ০০ পাইছি।ভালোই লাগল।মাস খানেক পড় মারে কইলাম মা ট্যাকা দেওয়া বিশ্ব বিদ্যালয়ে ফর্ম কিনা লাগব।
মা কাঁদ কাঁদ হইয়া কইল  "আমি কই পামু বাজান"
ঠিকি তো মা কই পাইব। মা কাঁদতিছে তাই রাস্তার দিকে হাটতে আইলাম।হঠাৎ পাশের বাড়ির মামুন আইসা কইল, "শিহাব বাই, শিহাব বাই
তোমার তো পরিক্ষা শেষ।আমি কয়ডা ট্যাকা দিমুনে,আমারে তোমার পুরাতন বইগুলান দেও।গরীবের কষ্ট  আমার চেয়ে ক্যাডা ভালো জানে।কইলাম ট্যাক্যা লাগব না, গোছায় রাখুমনি,কাল নিস।সকালে বইগুলান শেষবারের মতোন হাত বুলাচ্ছি। কোনো এই আর বই ধরা হবি না।এই বই ক্যানো বইই আর ধরা হবি না।

বইয়ের পাতা উলটাতে উলটাতে একটা হলুদ খাম দেখলাম।এটা সেই চিঠিডা না! হ এই চিঠিডাই।এতে লেখা ছিল ৫মাসের বকেয়া সহ পরিক্ষার ফী জমা না দিলে প্রবেশ পত্র দেওয়া হবে না।
আর তাই তো আমি পরিক্ষা দিবার চাই নাই।দিব কেমন কতৃপক্ষই দিতে দিব না। আমার জন্যি বকেয়া দেওয়ার চাই তে পরিক্ষা না দেওয়াই সহজ ছিল।
আচ্ছা তাহলে আমি পরিক্ষা দিলাম ক্যামনে।

দিলাম এক ভোঁ দৌড় শাসসুলের বাড়ির দিকে।গিয়া কইলাম,
শামসু তোরের আমার প্রবেশ পত্রকে দিসে?

শামসু কইল, "সেদিন রাস্তা দিয়া যাইতেছিলাম।দেখি সাজু স্যার। আমায় কইল,ক্যারে শিহাব হারামদাজার বাড়ি কোনটারে।হারামজাদা প্রবেশ পত্র নেয় নাই।
আমি কইলাম স্যার আমি তো ওর বাড়ির সামনেই যাব।আমারে দ্যান। স্যার বলল, হ নে,আমি আবার অর বাড়ি চিনি না।আচ্ছা দেইস। আর ওরে কস, ওরেঅনেক বকছি মনে য্যানো কিছু নেয় না আর ভালো করে পরিক্ষা দেয়।"
আমি আবার দৌড়ানো শুরু করলাম।
শামসুল কইল ঐ ঐ কই যাস।দৌড়রাস কে?
আমি দৌড়াছছি, আর কইতাছি, ওরে শামসু আমি ভুল করছি,পাপ করছি, ফেরেস্তারে মাথা না রাইখা পায়ের নিচা রাখছি।ওরে শামসু....... 

(শামসুল পিছন থেকে ডাকছে কিন্তু কোনো কথায় যায় না শিহাবের কানে।)

(মহাজনের ওটোর সামনে দাড়ায় শিহাব।)

মহাজন, মহাজন আমার একটা উপকার করেন।আজ সারাডা দিনের জন্য আমার আপনার অটো খান দেন আমার ৮০০ ট্যাক্যা   হলে আপনারে ৬০০ দিয়া বাকি ২০০ আমি নিমু।আমি কোনো বকেয়া রাহিনা তাই মহাজন দিয়া দিল।আর  আজ কোনো প্যাসেঞ্জারের সাথে দামাদামি করলাম না।যে যাই দিল হেইডাই নিলাম।বিকাল ৪টায় গুনে দেখি ৭৯৮ ট্যাকা হইছে।আর ২টাহা কই পাই।হটাৎ একটা লোক কইল, বাজার যাবা?
এই তো পাইয়া গেছি প্যাসেঞ্জার। বাজারের ভাড়া ৩০ ট্যাক্যা।
কইলা যামু ওঠেন।লোকটা কইল ভাড়া কিন্তু ১৫ টাকা দিমু।কইলাম ওঠেন ওঠেন।
বাজারে নাইমা ওনি ২০ ট্যাকার নোট দিলেন।আমি ১৮ ট্যাকা ফেরত দিয়া কইলাম স্যার আমার এই ২ট্যাকাই যথেষ্ট আর লাগব না।

দিলাম অটো নিয়া উড়াল।লোকটা ডাকতাসে।আমি আর থামলাম না।মহাজনরে ট্যাক্যা দিয়া হাফ কেজি মিষ্টি নিয়া দৌড় দিলাম।একদম থামলাম স্যারের বাড়ি।

দেখি বাড়িতে অনেক লোকজন।কলিজাডা ছ্যাত করল। এত লোক ক্যা?

কাছে যাই দ্যাখলাম, স্যার মাটিতে বইসা আছে আর তার মাথা রক্ত। মিষ্টি স্যারের পায়ের কাছে থুইয়া, আমি কইলাম, স্যার ও স্যার আপনার কি হইছে।ক্যাডা আপনারে মারছে?
ওই ক্যাডারে, কোন শালা ক্যাডার মারছেরে!স্যার একবার কন ক্যাডাঁ! আমি তারে মাইরা বানের পানিতে ভাসাই মু।

(একটা লাঠি হাতে নিয়ে ছুটাছঁটি করছে শিহাব।)

সাজু স্যার বলল, ওরে পাগলাম থাম থাম কিছু হয় নাই।উষ্টা খাইয়া ইটের উপর পইড়া গেছি তাই মাথা ফাঠছে।
স্যাররে কইলাম, স্যার আপনি আমার বকেয়াটা দিসেন তাই না?
স্যার কইল "শিহাব ভিতরে চল,তুই থানায় ৩য় হইছোস।তোর চাচি নাড়ু আর পায়েস বানাইছে"

"ও স্যার কননা আপনি দিসেন।"

 স্যার বলল" তোর বাড়ি যাইবার বের হইছি কালা বিড়ালটা পথ কাডল।বুঝবার পারছিলাম কিছু হবে।"

আমি তারে যতই কই কেডা দিসে তিনি খালি অন্য কথা কয়।
আমি চোখ বন্ধ কইরাস যাইতাছি আর বার বার কইতাসি, স্যার কন না ক্যাডা বকেয়া গুলা দিসে।স্যার টাইনা নিয়া যাচ্ছে।
হায়রে অধম আমি আইজকা যেমন অতগুলো মানুষের ভিতর থাইকা আমায় টাইনা আনল সেদিনও আমায় তিনি পড়ালেহার  জন্য হৃদয় দিয়া টানছিল।আর আমি তারে!
কালা বিড়াল ও জানে আমি ভালা ছেলে না এই সব স্নেহ আমার প্রাপ্য  না তাই পথ কাটছে।

সাজু স্যার "মতির মা ও মতির মা দ্যাহ ক্যাডা আইছে, শিহাব গো সিহাব!"

স্যার কন না ক্যাডা দিসে

"তুই ৩য় হইছিস শুইনা তোর জন্যই নাড়ু আর পায়েস নিয়া যাবার ধরছি আর মরার ইট পায়ে লাগল।
ও মতির মা কই গেলা।"
শিহাব তোর চাচি মনে  হয় আমার লাইহা গ্যান্দার পাতা আনতে গেছে। মাথায় লাগাই দিব।আমার কিছু হইলে হুস থাহেনা মতির মা।পাগল হইয়া যায়"

তুই বস।আমিই পায়েস আনি তোর জন্যি।
 স্যারের দেওয়া চেয়ারে আমি বসল লাম।আমি অ্যাহনো চোখ খুলি নাই।শরীরডা ক্যামুন জানি শির শির করতাছে
মাথা ঘুরতাছে।
হঠাৎ মুখ দিয়া বাইর হইল, ও স্যার আপনে না সাইকেল চালান আপনে ক্যামনে ইটের সাথে লাগলেন।ওর স্যার আপনার সাইকেল ডা কই। আপনেরে যে আমি দেখছি সাইকেল ছাড়া।(বলে কাঁদতে লাগল শিহাব)
স্যার তাহলে কি আপনি আমার লাইগা আপনার বাপের আমলের সাইকেল ডা......
কাঁদতে লাগল শিহাব।
পায়েসের পাতিল আর ডাকনার শব্দ আমার  কানে আসতাছে ।স্যার আমার কথা কিহ আপনি শোনেন না কন না স্যার আপনার সাইকেল ডা কই....আমারে আর ঋণী কইরেন না।কন  না,আপনে আপনার  বাপের দেওয়া সাইকেল ডা কই..........

(কাঁদতে থাকে শিহাব)।

লেখকঃ বিত্ত রহমান

0 Comments Here
Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
আমি এবং..
আমি এবং মধ্যবয়স্ক জুটি

 আমি অপু।পড়া-লেখা শেষ করে প্রাইভেট একটা কম্পানীতে চাকরী করছি।গতকাল ঢাকায় এসেছি। কম্পানী থেকে আমাকে একটা ট্রেনিং..


StorialTechবউ + যৌতুক
বউ + যৌতুক

আজ আমার সবচাইতে খুশির দিন।যেন মনে হচ্ছে আমাদের সেই স্কুল লাইফের আবুল স্যারের বাই সাইকেলের টায়ার..


প্রতিশোধ
প্রতিশোধ

ঘুম ভাঙতেই রজত টের পেল ট্রেনটা স্টেশনে থেমেছে। বাইরে হকারদের চিঙ্কার, ব্যস্ত লোকজনের মালপত্র নিয়ে এদিক..