ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী

দুধের মতাে সাদা ধবধবে তেজী ঘােড়া ছুটিয়ে এক তেজী। জোয়ান রাজপুত্র মস্তো বড় এক তেপান্তর মাঠ পার হয়ে চলেছেন। আকাশে তখন সূয্যিমামা ডুবু-ডুবু, রাজপুত্তরের দিকে তাকিয়ে ফিকফিক করে হাসছেন আর টকটকে রাঙা সিঁদুর ছড়িয়েছিটিয়ে দিচ্ছেন শূন্যের নীল চাদোয়াখানায়।

রাজপুত্তরের ছােট্ট বােনটির ভারি অসুখ। অসুখ হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে হাসতে ভুলে গেছে। সােনার রঙের মুখখানি। শুকনাে পাতার মতাে এখন কালচে। তার চোখের তারায় আর সেই ঝলমলে দুষ্টুমি নেই, মজা করার ঝমকানি নেই। বুড়াে মানুষদের মতাে ফাকা শূন্যি চোখের তারা দু-টি।

বদ্যিমশাই বলেছেন, দাবিড় দেশের নীল সমুদুরের তীরে, কালাে হলুদ আর খয়েরি রঙের বালির বুকে দাড়ি আর ফল হয়, সেই ফল-ফুল এনে রাজকন্যাকে খাওয়ালে আর মালা পরালে, রাজকন্যা আবার আগের মতাে সুস্থ, সহজ, হাসিখুশি হয়ে যাবে।।

তাই তার দাদা চলেছেন ছােট্ট বােনটির জন্যে অজানা দাবিড় দেশ, জম্বুদীপে ফল আর ফুল আনতে।

তেরাে মাস তেরাে দিন কেটে গেল, ঘােড়া ছুটছে তাে ছুটছেই। পঙ্খিরাজ ঘােড়া তাে? ওদের ক্ষিদে তেষ্টা নেই। রাজপুত্ত্বর মাঝে মাঝে বনের ভেতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে গাছ থেকে পাকা ফল পেড়ে খান। ঝর্ণা থেকে আঁজলা ভমে ঠাণ্ডা জল চুমুক দিয়ে খান! সেই জল মাথায় মুখে ছিটিয়ে দেন ঘােড়ার আর নিজের। | বনের বাঁদর, হরিণ, পাখ-পাখালিদের জিজ্ঞেস করেন। জম্বুদ্বীপের দাবিড় দেশ কোন্ দিকে, কতাে দূরে?

বনের ময়না-টিয়া-হীরামনরা বলে দেয়। বলে দেয় কাঠবেড়ালিরা, কাঠঠোকরারা, বাঁদর-হনুমানেরা : কিচ্‌-কি হুপহুপ ওই...ওই পূবদিকে, যেদিক দিয়ে সূয্যিমামা ভােরবেলায় উঁকি দেন আলাে ছড়িয়ে।

রাজপুত্ত্বর তেরাে মাস তেরাে দিন ছুটে ছুটে ছুটে হা-ক্লান্ত হয়ে, | একদিন সন্ধ্যেবেলায় প্রকাণ্ড এক বুড়াে বটগাছের নিচে ঘােড়া থামালেন। বটগাছ তাে নয়। সে যেন একলাই একটি মহা অরণ্যি। তার মােটা মােটা ঝুরি নেমেছে হাজার হাজার, যেন মহারাজকে ঘিরে চারিদিকে গাে-ওল হয়ে খাড়া আছে জওয়ান সৈনিকের সারির পর সারি। অস্ত্র হাতিয়ারের ঝনঝনার মতাে। আওয়াজ উঠছে তাদের পাতায়, পাতায়, ডালে ডালে। | রাজপুত্তুর ঘােড়া থেকে লাফিয়ে নেমে বটগাছকে নমস্কার করে। বললেন, আমি অতিথি। আপনার আশ্রয়ে আজ রাত্তিরটা এখানে। বিশ্রাম করতে চাই।'

বুড়াে-বটগাছ ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “আরে, এসাে এসাে। কী ভাগ্যি! মানুষ অতিথি পেলুম কতাে কাল পরে। এতাে দূরে, এতাে নিরালায় মানুষজন তাে এ যুগে আর কেউ আসে না। তাই অতিথি। সেবার পুণ্যি এখন আর পাই না। ওরে, তােরা বাতাস কর সবাই অতিথিকে। ফল জল খেতে দে।'

কোলাহল পড়ে গেলে বুড়াে-বটগাছতলায়।

গভীর রাত্তিরে রাজপুত্তরের ঘুম ভেঙে গেল মানুষের গলার আওয়াজে। গাছ কথা কয় গাছেদের ভাষায়। পাখি কথা কয়। পাখিদের ভাষায়। বাদর, হরিণ, শেয়াল, শুয়াের কথা কয় পশুদের। ভাষায়! রাজপুতুর সব্বাইকার সব রকম ভাষাই জানেন। নইলে আর রাজপুত্তুর কিসের। শুধু রাজ-পােশাক, রাজমুকুট, মুক্তোর মালা, জরির পাগড়ি আর রথ, হাতি, ডােড়া থাকলেই তাে যথার্থ রাজপুত্তুর হওয়া যায় না। ও রকম রাজপুত্তুর যাত্রার মেলাতেও দেখা যায়। কতাে। সত্যিকার রাজপুত্তুর যে, সে তার রাজ্যে যারা বাস করে, তাদের সবাইকার ভাষা জানে। সলকার সুখ-দুঃখ কী, তা বুঝতে । ভুল করে না। তা সে হাতি, ঘােড়া, বাঘ, সিংহ, পিপড়ে, পােকা, । মশা-মাছি, গাছ-পালা, নদী-নালা যাই-ই হােক না কেন।

রাজপুত্ত্বর শুনতে পেলেন, বটগাছের চূডাের কোটরের ভেতর। থেকে মানুষের ভাষায় কে যেন বলছে : আরে, দাবিড় দেশ তাে। এই সামনের পাহাড়টার ঐ পিঠেই, অথৈ নীল সমুদুরের ধারে।

 

সেখানেই তাে লালবালি কালােবালির উপর দাড়িম বন আছে। কত সুন্দর সুন্দর লাল লাল দাড়িম ফুল হয় ঠিক এই সময়েই । ফলও ধরে ঐ গাছগুলােয় বারাে মাসই। রাজপুত্তুর যদি পখিরাজের ডানা জোড়া খুলে নিয়ে মেঘ ছোঁওয়া পাহাড়টা চট করে উড়ে পার হয়ে যেতে পারে, তাহলে সমুদুরের ধারে লালটুকটুকে ফুলে আলাে করা দাড়িম বন, আকাশ থেকেই দেখতে পাওয়া যাবে। ঘােড়া সেখানে নেমে পেট ভরে দাড়িম ফল, দাড়িম দানা খেতে পাবে।

একটি মেয়ের গলা শােনা গেল ; কিন্তু রাজপুত্ত্বর ছােটবােনটির জন্যে কী করে দাড়িমফল আর ফুল নিয়ে যাবেকবলাে তাে? গাছ তাে ভীষণ কাঁটায় ভরা। আর বন ঘিরে আছে চেরাজিভ দু-মুখাে বিষ-সাপে।

ভারি পুরুষ গলায় শােনা গেল : তার জন্যে নিতে হয় এই বুড়াে বটের গাছের বাকলের থলি। বাকল খুলে থলি বানানাে একটুও শক্ত নয়। আর বট গাছতলায় পড়ে আছে যে আমাদের ঠোকরানাে বটফল, সেই ফল ভর্তি করে নিয়ে গিয়ে সাপেদের গায়ে ছড়িয়ে দিলে সব সাপ মরে যাবে। তখন ফুল আর ফল সেই থলিতেই ভর্তি করে আনা যাবে।।

রাজপুত্তুর চাদের আলােয় ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, বটগাছের কোটরে মস্তো বড় বড় দুটো পাখি ঐ সব কথা বলছে। বুঝতে পারলেন, ওরাই হচ্ছে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী যারা মানুষের তিন কালের কথা জানে। মানুষের মনের কথা বুঝতে পারে। আর পাখি হলেও যাদের ভাষা ঠিক মানুষেরই মতাে।

ভাের হতে না হতেই রাজপুত্তুর ঘােড়ার পিঠের ডানা দু-খানা খুলে খাড়া করে দিলেন। তারপর বুড়াে বটকে পেন্নাম করে, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীকে পেন্নাম করে ঘােড়ার পিঠে চড়লেন। | চিহি-হি-হি করে জোর আওয়াজ তুলে ঘােড়া এবার আকাশে উড়লাে, পেটের তলায় চার পা গুটিয়ে নিয়ে।

তারপর? তারপর আর কি! তিনি দাড়িম বনে পৌছে, বটবাকলের থলি থেকে পাখি-ঠোকরানাে শুকনাে বটফলগুলাে নিচে ছড়িয়ে ছড়িয়ে ফেলতে ফেলতে দাড়িম বনে নেমে এলেন। সমস্ত দ-মুখাে সাপগুলাে তখন চেরাজিভ লকলকিয়ে নেতিয়ে মরে পড়ে আছে। | রাজপুত্তুর থলে ভর্তি করে ফল আর ফুল পেড়ে নিয়ে আবার ঘােড়ার পিঠে চাপলেন।

| এবার আর পক্ষিরাজের ডানা বন্ধ রাখলেন না। আকাশ বেয়ে। হু-হু-হু-হু করে উড়ে নিজের রাজ্যে এসে নামলেন। বাড়ি ফিরে এলেন আঠারাে মাস বাদে। মানে, ঠিক দেড় বচ্ছর পর।।

এদিকে রাজপুরের বাবা-মা, রাজা আর রানী ছেলের বিপদআপদ হয়েছে বেবে কেঁদে-কেঁদে পাগলের মতাে হয়ে পড়েছেন। অবশেষে ফিরে এলেন রাজপুত্তুর।। | রাজপুত্তুর ছােট বােনটির বিছানায় মুঠো মুঠো দাড়িম ফুল ছড়িয়ে দিলেন। তার সারা গা ঢেকে গেল লাল ফুলে। খাইয়ে দিলেন ফল ভেঙে দাড়িমদানা আঁজলা ভরে। রাজকন্যা হাসতে হাসতে উঠে বসলাে বিছানায় আহ্লাদ করে বলল, 'দাদা, তুমি আমায় কি খাওয়ালে? আমার যে দৌড় তে ইচ্ছে করছে। নূপুর পরে। নাচতে ইচ্ছে করছে।' রাজ্য সুষ্ঠ প্রজারা আর বদ্যিমশাইরা এসে হৈ হৈ করে আনন্দ করতে লাগলেন।

রাজামশাই আর রাণীমা এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন।

সবাই বলতে লাগল : ‘ধন্যি রাজকুমার। আজ থেকে আমরা । | তােমার নাম দিলুম ডালিমকুমার।

0 Comments Here
Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
প্রেমের ফাঁদে..
প্রেমের ফাঁদে (পূর্ণদৈর্ঘ্য শেষ অংশ)

-এই যে শুনুন।(আমি)
-জ্বি ম্যাডাম বলুন।(নাহিদ)
-এই নিন আপনার ছাতার টাকা।
-মানে!!
..


StorialTechনিছক এখটু ভয় দেখানো
নিছক এখটু ভয় দেখানো

ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতার ফ্লাইটে উঠেই শান্তনু টের পেল ফ্লাইটটা বেশ ফাঁকা। সামান্য কিছু যাত্রী ছড়িয়ে ছিটিয়ে..


StorialTechঅবনির চোখে জল
অবনির চোখে জল

দুঃখ আর হতাশা একটা ছেলের জন্য যতটুকু সহনীয় মেয়েদের জন্য নাকি তা আরও বেশি সহনীয়।কিন্তু,এই কষ্ট..